🧩 শিশুর বিকাশ

শিশুর অটিজম (Autism Spectrum Disorder): লক্ষণ, নির্ণয় ও করণীয়

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD) হলো মস্তিষ্কের একটি স্নায়ু-বিকাশজনিত অবস্থা, যা শিশুর সামাজিক যোগাযোগ, ভাষা এবং আচরণে প্রভাব ফেলে। প্রতিটি শিশুর মধ্যে এর প্রকাশ ভিন্ন হয় — তাই একে "স্পেকট্রাম" বলা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে চিহ্নিত করে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে শিশুর সার্বিক বিকাশে ভালো ফল পাওয়া যায়। চাঁদপুরের শিশু ও নবজাতক বিশেষজ্ঞ ডা. মো. নাজমুল হাসান-এর এই গাইডে জানুন লক্ষণ, নির্ণয় পদ্ধতি ও করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত।

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার কী?

অটিজম হলো মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যপ্রণালীর একটি ভিন্নতা, যার প্রভাবে শিশুর সামাজিক যোগাযোগ, ভাষার ব্যবহার এবং আচরণের ধরনে পার্থক্য দেখা যায়। এটি কোনো রোগ নয় বরং একটি নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল অবস্থা, যা সাধারণত জীবনভর থাকে। "স্পেকট্রাম" শব্দটি ব্যবহার করা হয় কারণ এর তীব্রতা ও প্রকাশভঙ্গি শিশুভেদে ব্যাপক পার্থক্য দেখায় — কিছু শিশু হালকা মাত্রার সমস্যায় ভোগে এবং স্বাভাবিক স্কুলে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে, আবার কিছু শিশুর ক্ষেত্রে সহায়তা ছাড়া দৈনন্দিন কাজ চালানো কঠিন হয়।

💡 ছেলে না মেয়ে — পার্থক্য আছে কি?

ছেলে শিশুদের মধ্যে অটিজম ধরা পড়ার হার মেয়ে শিশুদের তুলনায় বেশি লক্ষ করা যায়। তবে মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো অনেক সময় কম স্পষ্ট থাকে বলে নির্ণয় হতে দেরি হতে পারে। তাই লক্ষণ মৃদু মনে হলেও অবহেলা না করে মূল্যায়ন করানো উচিত।

অটিজমের প্রধান লক্ষণসমূহ

অটিজমের লক্ষণগুলোকে মোটাদাগে তিনটি ক্ষেত্রে ভাগ করা যায় — সামাজিক যোগাযোগ, ভাষা ও যোগাযোগ, এবং আচরণগত ধরন।

১. সামাজিক যোগাযোগে সমস্যা

শিশু চোখে চোখ রেখে তাকায় না, নাম ধরে ডাকলে নিয়মিত সাড়া দেয় না, মুখভঙ্গি বা হাসি বিনিময় করে না এবং অন্যের আবেগ বুঝতে বা নিজের আবেগ প্রকাশ করতে অসুবিধা হয়। অনেক শিশু একা খেলতে পছন্দ করে এবং সমবয়সী অন্য শিশুদের সাথে মিশতে আগ্রহ দেখায় না।

২. ভাষা ও যোগাযোগে বিলম্ব বা ভিন্নতা

কথা বলা শুরু হতে দেরি হওয়া, শব্দ শেখার পর তা হারিয়ে ফেলা (Regression), একই কথা বা বাক্য বারবার পুনরাবৃত্তি করা (Echolalia), এবং ইশারা বা অঙ্গভঙ্গি ব্যবহার করে চাহিদা প্রকাশ না করতে পারা — এসব অটিজমের সাধারণ লক্ষণ।

৩. পুনরাবৃত্তিমূলক ও সীমাবদ্ধ আচরণ

হাত নাড়ানো বা শরীর দোলানোর মতো একই কাজ বারবার করা, খেলনা ঘোরানোর মতো নির্দিষ্ট বস্তুতে অস্বাভাবিক আগ্রহ, দৈনন্দিন রুটিনে সামান্য পরিবর্তন হলেই অস্থির বা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠা, এবং নির্দিষ্ট কিছু খাবার ছাড়া অন্য কিছু খেতে না চাওয়া এই শ্রেণির মধ্যে পড়ে।

৪. সংবেদনশীলতার পার্থক্য (Sensory Sensitivity)

কিছু শিশু শব্দ, আলো বা স্পর্শের প্রতি অস্বাভাবিক রকম সংবেদনশীল হয় — উচ্চ শব্দে কান চেপে ধরা বা নির্দিষ্ট কাপড়ের স্পর্শ সহ্য করতে না পারার মতো প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে।

অটিজমের কারণ

অটিজমের সুনির্দিষ্ট একক কারণ এখনও বিজ্ঞানীরা নিশ্চিতভাবে বের করতে পারেননি। তবে গবেষণায় জিনগত ও মস্তিষ্কের বিকাশজনিত কিছু বিষয় উঠে এসেছে:

⚠️ প্রচলিত ভুল ধারণা

টিকা দেওয়ার কারণে অটিজম হয় — এই ধারণাটি বহু আন্তর্জাতিক গবেষণায় ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এ ছাড়া অটিজম বাবা-মায়ের লালন-পালনের ত্রুটির কারণে হয় না — এটি সম্পূর্ণভাবে মস্তিষ্কের স্নায়ু-বিকাশজনিত একটি বিষয়, কারও দোষে হয় না।

বয়স অনুযায়ী লক্ষণ ও সতর্কতা

অধিকাংশ ক্ষেত্রে ১৮ মাস থেকে ৩ বছর বয়সের মধ্যে অটিজমের লক্ষণ স্পষ্ট হতে শুরু করে। নিচের সারণিতে বয়সভিত্তিক সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখানো হলো:

বয়স সতর্কতামূলক লক্ষণ
৬ মাসহাসি বা আনন্দ প্রকাশ কম, চোখে চোখ রাখতে না চাওয়া
৯–১২ মাসনাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া, বাবল না করা, ইশারা ব্যবহার না করা
১৬–১৮ মাসএকটিও অর্থবহ শব্দ না বলা, কোনো কিছু দেখানোর জন্য আঙুল না তোলা
২৪ মাসদুই শব্দের বাক্য গঠন করতে না পারা, খেলায় ভান বা কল্পনা (Pretend Play) না থাকা
৩ বছরঅন্য শিশুদের সাথে মিশতে না চাওয়া, পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ স্পষ্ট হওয়া, আগে বলতে পারা শব্দ হারিয়ে ফেলা

নির্ণয় পদ্ধতি

অটিজম শনাক্ত করার জন্য রক্ত পরীক্ষা বা ব্রেইন স্ক্যানের মতো কোনো একক নির্দিষ্ট ল্যাব পরীক্ষা নেই। নির্ণয় করা হয় শিশুর আচরণ, বিকাশ ও যোগাযোগের ধরন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। সাধারণ ধাপগুলো হলো:

১. ডেভেলপমেন্টাল স্ক্রিনিং

প্রতিটি নিয়মিত চেকআপে শিশু বিশেষজ্ঞ M-CHAT (Modified Checklist for Autism in Toddlers)-এর মতো একটি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে প্রাথমিক ঝুঁকি যাচাই করেন। এটি একটি স্ক্রিনিং টুল মাত্র — চূড়ান্ত নির্ণয় নয়।

২. বিস্তারিত ডেভেলপমেন্টাল মূল্যায়ন

স্ক্রিনিংয়ে ঝুঁকি ধরা পড়লে শিশু বিশেষজ্ঞ, শিশু নিউরোলজিস্ট, শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও স্পিচ থেরাপিস্ট সমন্বিতভাবে শিশুর সামাজিক আচরণ, ভাষা এবং খেলার ধরন পর্যবেক্ষণ করে বিস্তারিত মূল্যায়ন করেন।

৩. শ্রবণ ও অন্যান্য পরীক্ষা

ভাষায় দেরির অন্য কোনো কারণ, যেমন শ্রবণজনিত সমস্যা, আছে কিনা তা বাদ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনে হিয়ারিং টেস্ট ও অন্যান্য পরীক্ষা করানো হতে পারে।

💡 কত আগে নির্ণয় সম্ভব?

অনেক ক্ষেত্রে দেড় থেকে দুই বছর বয়সেই নির্ভরযোগ্যভাবে অটিজমের লক্ষণ চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। মৃদু মাত্রার লক্ষণযুক্ত শিশুদের ক্ষেত্রে নির্ণয় হতে কিছুটা বেশি সময় লাগতে পারে।

চিকিৎসা ও করণীয়

অটিজমের কোনো একক "নিরাময়" নেই, তবে সঠিক ও প্রাথমিক চিকিৎসা মাধ্যমে শিশুর যোগাযোগ, সামাজিক দক্ষতা ও দৈনন্দিন কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা সম্ভব। প্রথমেই একজন অভিজ্ঞ শিশু ও নবজাতক বিশেষজ্ঞ-এর কাছে মূল্যায়ন করানো জরুরি।

থেরাপির ধরন যা সাহায্য করে
বিহেভিয়ার থেরাপি (ABA)ইতিবাচক আচরণ শেখা ও অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ কমানো
স্পিচ থেরাপিভাষা, উচ্চারণ ও যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি
অকুপেশনাল থেরাপিদৈনন্দিন কাজ, সংবেদনশীলতা ও মোটর দক্ষতা উন্নয়ন
সোশ্যাল স্কিল ট্রেনিংঅন্যের সাথে মেলামেশা ও আবেগ বোঝার দক্ষতা

বাসায় বাবা-মা কী করতে পারেন?

⚠️ এই ভুলগুলো করবেন না

  • "বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে" ভেবে ভেবে দেরি করবেন না — আগে ধরা পড়লে, আগে সাহায্য মেলে।
  • শিশুকে দোষারোপ করে বা জোর করে আচরণ পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন না
  • যাচাই না করা পদ্ধতি বা অপ্রমাণিত চিকিৎসার পেছনে সময় নষ্ট করবেন না — বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুসরণ করুন
  • শিশুর সংবেদনশীলতাকে জেদ বা দুষ্টুমি ভেবে উপেক্ষা করবেন না

প্রাথমিক চিকিৎসা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

মস্তিষ্কের বিকাশ সবচেয়ে দ্রুত ঘটে জীবনের প্রথম তিন বছরে। এই সময়ে চিকিৎসা শুরু করলে মস্তিষ্কের নমনীয়তার (Neuroplasticity) সুযোগ সবচেয়ে বেশি কাজে লাগানো যায়, যার ফলে ভাষা, সামাজিক ও আচরণগত দক্ষতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যেতে পারে। তাই সন্দেহ হওয়ামাত্র দেরি না করে মূল্যায়ন করানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

শিশুর আচরণ, যোগাযোগ বা সামাজিক মেলামেশায় ওপরে উল্লেখিত যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত। প্রাথমিক পর্যায়ে সন্দেহ হলেই মূল্যায়ন করানো নিরাপদ — অটিজম না থাকলেও এতে কোনো ক্ষতি নেই, কিন্তু থাকলে দ্রুত সহায়তা শুরু করা যায়।

✅ মনে রাখুন

অটিজম থাকা মানে শিশুর ভবিষ্যৎ সীমিত হয়ে যাওয়া নয়। সঠিক সময়ে নির্ণয় ও নিয়মিত থেরাপির মাধ্যমে অনেক অটিস্টিক শিশু স্বাভাবিক স্কুলে পড়াশোনা করে এবং স্বনির্ভর জীবনযাপন করে। সন্দেহ হলে অপেক্ষা না করে একজন অভিজ্ঞ শিশু ও নবজাতক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

ডা. মো. নাজমুল হাসান

MBBS, BCS (Health), MD (Paediatrics) | শিশু বিশেষজ্ঞ ও নবজাতক বিশেষজ্ঞ, চাঁদপুর

চাঁদপুরের অন্যতম বিশ্বস্ত শিশু ও নবজাতক বিশেষজ্ঞ ডা. নাজমুল হাসান NICU ও PICU-তে প্রশিক্ষিত এবং সিঙ্গাপুর থেকে আন্তর্জাতিক শিশু পুষ্টি সার্টিফিকেশনপ্রাপ্ত। শিশুর অটিজম, স্পিচ ডিলে ও অন্যান্য বিকাশজনিত সমস্যায় তিনি বিশেষভাবে দক্ষ। তিনি ডাক্তার বাড়ী, টেকনো হান্নান কমপ্লেক্স, হাজী মহসিন রোড, চাঁদপুরে প্রতিদিন বিকাল ২:৩০টা থেকে রোগী দেখেন।