🗣️ শিশুর বিকাশ

শিশুর কথা বলতে দেরি (স্পিচ ডিলে): কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা

অনেক বাবা-মা লক্ষ্য করেন, তাদের শিশু বয়সের তুলনায় কথা বলা শুরু করছে না বা অন্য শিশুদের চেয়ে অনেক কম শব্দ বলছে — একেই বলা হয় স্পিচ ও ল্যাংগুয়েজ ডিলে (Speech and Language Delay)। কিছু ক্ষেত্রে এটি সাময়িক ও নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়, আবার কিছু ক্ষেত্রে এর পেছনে থাকতে পারে শ্রবণজনিত সমস্যা, অটিজম বা স্নায়বিক কারণ। চাঁদপুরের শিশু ও নবজাতক বিশেষজ্ঞ ডা. মো. নাজমুল হাসান-এর এই গাইডে জানুন বিস্তারিত।

স্পিচ ও ল্যাংগুয়েজ ডিলে কী?

Speech এবং Language দুটি আলাদা বিষয়। Speech বলতে বোঝায় শব্দ উচ্চারণের শারীরিক ক্ষমতা — জিহ্বা, ঠোঁট, তালু ও স্বরযন্ত্রের সমন্বয়। আর Language বলতে বোঝায় ভাব প্রকাশ ও বোঝার ক্ষমতা — শব্দভাণ্ডার, বাক্য গঠন এবং অন্যের কথা বোঝা। কোনো শিশুর এই দুটির যেকোনো একটি বা উভয়ই বয়স অনুযায়ী প্রত্যাশিত পর্যায়ে না পৌঁছালে তাকে স্পিচ বা ল্যাংগুয়েজ ডিলে বলা হয়।

💡 ছেলে না মেয়ে — পার্থক্য আছে কি?

মেয়ে শিশুরা সাধারণত ছেলে শিশুদের তুলনায় একটু আগে কথা বলা শুরু করে, তবে এই ব্যবধান সাধারণত মাত্র ১–২ মাসের মধ্যে থাকে। প্রিম্যাচিউর শিশুর ক্ষেত্রে হিসাব করার সময় জন্ম তারিখ নয়, বরং প্রকৃত প্রসবের নির্ধারিত তারিখ থেকে গণনা করা উচিত — তাই সময়ের আগে জন্ম নেওয়া শিশুর কথা বলা একটু দেরিতে শুরু হলে তা স্বাভাবিক হতে পারে।

স্পিচ ডিলের ধরন

সব শিশুর কথা বলতে দেরি হওয়ার ধরন এক রকম নয়। প্রধান ধরনগুলো হলো:

১. এক্সপ্রেসিভ ল্যাংগুয়েজ ডিলে (Expressive Language Delay)

শিশু অন্যের কথা ভালোভাবে বোঝে, নির্দেশনা মেনে চলতে পারে, কিন্তু নিজে কথায় প্রকাশ করতে বা শব্দ উচ্চারণ করতে দেরি করে। এটি সবচেয়ে সাধারণ ধরন।

২. রিসেপটিভ ল্যাংগুয়েজ ডিলে (Receptive Language Delay)

শিশু অন্যের কথা বা সাধারণ নির্দেশনাই ঠিকমতো বুঝতে পারে না — নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না, সহজ কথাও অনুসরণ করতে পারে না। এটি তুলনামূলক বেশি গুরুত্বসহকারে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

৩. স্পিচ সাউন্ড ডিসঅর্ডার (Articulation Problem)

শিশু শব্দভাণ্ডার ও বোঝাপড়ায় স্বাভাবিক, কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু শব্দ বা অক্ষর স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতে পারে না — যেমন 'র', 'স', 'শ' ইত্যাদি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এটি ঠিক হয়ে যেতে পারে, বেশি দেরি হলে স্পিচ থেরাপি প্রয়োজন হয়।

৪. গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টাল ডিলের অংশ হিসেবে

কিছু ক্ষেত্রে স্পিচ ডিলে একা আসে না — হাঁটা, বসা, সামাজিক আচরণের বিকাশেও দেরি দেখা যায়। এসব ক্ষেত্রে সার্বিক মূল্যায়ন প্রয়োজন, কারণ এর পেছনে অটিজম বা অন্যান্য নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল কারণ থাকতে পারে।

কথা বলতে দেরির কারণ

শিশুর কথা বলতে দেরির পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। প্রধান কারণগুলো হলো:

১. শ্রবণজনিত সমস্যা (Hearing Loss)

শিশু ঠিকমতো শুনতে না পারলে সে শব্দ শিখতে ও নকল করতে পারে না। বারবার কানে ইনফেকশন হলে বা জন্মগত শ্রবণ সমস্যা থাকলেও কথা বলা দেরিতে শুরু হয়। তাই স্পিচ ডিলে সন্দেহ হলে সবার আগে শ্রবণ পরীক্ষা করানো জরুরি।

২. অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার

এক্ষেত্রে হাঁটাচলায় সমস্যা না থাকলেও শিশু চোখে চোখ রাখে না, নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না, অন্য শিশুদের সাথে মিশতে চায় না এবং একই ধরনের আচরণ বারবার করে।

৩. পরিবেশগত কারণ

বাবা-মা বা পরিবারের সদস্যরা শিশুর সাথে কম কথা বললে, বা শিশুকে অতিরিক্ত মোবাইল/স্ক্রিনে ব্যস্ত রাখা হলে ভাষা শেখার সুযোগ কমে যায়। মোবাইল বা টিভির সামনে বেশি সময় কাটানো আজকাল দেরিতে কথা বলার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৪. জন্মগত হাইপোথাইরয়েডিজম

থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি থাকলে শিশুর সার্বিক বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হয়, যার ফলে কথা বলাও দেরিতে শুরু হতে পারে। জিহ্বা বড় থাকা, পেট ফোলা থাকা বা হাঁটতে-বসতে দেরি হওয়া এর সাথে সম্পর্কিত লক্ষণ হতে পারে।

৫. মুখ ও তালুর গঠনগত সমস্যা

ঠোঁট কাটা বা তালু কাটা (Cleft Lip/Palate), জিহ্বার নিচের বন্ধনী ছোট হওয়া (Tongue-tie) ইত্যাদি কারণে শব্দ উচ্চারণে সমস্যা হতে পারে।

৬. অন্যান্য কারণ

💡 দুই ভাষা শেখানো কি দেরির কারণ?

বাসায় একাধিক ভাষায় কথা বলা হলে শিশু শুরুতে দুই ভাষার শব্দ মিশিয়ে ফেলতে পারে বা কিছুটা ধীরে অগ্রসর হতে পারে — এটি প্রকৃত স্পিচ ডিলে নয়, বরং স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে দুটি ভাষাতেই বয়স অনুযায়ী কোনো অগ্রগতি না থাকলে মূল্যায়ন প্রয়োজন।

বয়স অনুযায়ী লক্ষণ ও মাইলস্টোন

নিচের সারণিতে সাধারণ বয়সভিত্তিক ভাষার মাইলস্টোন এবং কোন বয়সে কতটুকু অর্জিত না হলে সতর্ক হওয়া উচিত তা দেখানো হলো:

বয়স প্রত্যাশিত দক্ষতা সতর্ক হবেন যদি
৬–৯ মাসবাবল করা (বা-বা, দা-দা জাতীয় শব্দ)একদমই বাবল না করলে
১২ মাস"মা", "বাবা" জাতীয় সাধারণ শব্দ বলা, নাম ডাকলে সাড়া দেওয়ানাম ধরে ডাকলে সাড়া না দিলে
১৮ মাসঅন্তত ১০–২০টি শব্দ বলতে পারাএকটিও অর্থবহ শব্দ না বললে
২৪ মাসদুই শব্দের বাক্য বলা ("মা দাও", "পাখি যা")দুই শব্দ জুড়ে বলতে না পারলে
৩ বছর৫০+ শব্দ, ছোট বাক্য গঠন, প্রশ্নের উত্তর দেওয়াঅপরিচিতরাও বাক্য বুঝতে না পারলে

অন্যান্য সতর্কতামূলক লক্ষণ

চিকিৎসা ও করণীয়

স্পিচ ডিলের চিকিৎসা মূলত এর কারণের ওপর নির্ভর করে। সঠিক মূল্যায়নের জন্য একজন অভিজ্ঞ শিশু ও নবজাতক বিশেষজ্ঞ-এর পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন:

সম্ভাব্য কারণ প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন চিকিৎসা পদ্ধতি
শ্রবণ সমস্যাHearing/Audiometry Testশ্রবণ যন্ত্র বা ইএনটি চিকিৎসা
অটিজম সন্দেহDevelopmental Screeningবিহেভিয়ার থেরাপি, স্পিচ থেরাপি
থাইরয়েড সমস্যাThyroid Function Testহরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি
শুধু স্পিচ ডিলেSpeech-Language Assessmentস্পিচ থেরাপি ও বাসায় ভাষা-উদ্দীপনা

স্পিচ থেরাপি কীভাবে সাহায্য করে?

একজন প্রশিক্ষিত স্পিচ-ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট খেলার ছলে বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে শিশুর শব্দভাণ্ডার, উচ্চারণ ও বাক্য গঠনের ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করেন। যত আগে শুরু করা যায়, ফলাফল তত ভালো হয় — বিশেষত ৩ বছর বয়সের আগে হস্তক্ষেপ করা গেলে মস্তিষ্কের বিকাশের সুবিধা সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়।

বাসায় বাবা-মা কী করতে পারেন?

⚠️ এই ভুলগুলো করবেন না

  • অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম দেবেন না — মোবাইল বা টিভি ভাষা শেখার প্রকৃত বিকল্প নয়
  • "ছেলেরা দেরিতেই কথা বলে" বলে উপেক্ষা করবেন না — মূল্যায়ন করানোই নিরাপদ
  • শিশুর প্রতিটি চাহিদা তার ইশারা দেখেই পূরণ করবেন না — তাকে শব্দে বলার সুযোগ দিন
  • শিশুকে বকা দিয়ে বা চাপ দিয়ে জোর করে বলাতে যাবেন না — এতে সে আরও কথা বলা এড়িয়ে যেতে পারে
  • "বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে" ভেবে মূল্যায়ন পিছিয়ে দেবেন না — দেরিতে হস্তক্ষেপ করলে ফলাফল কম আসে

প্রতিরোধ ও প্রাথমিক উদ্দীপনার উপায়

সব ক্ষেত্রে প্রতিরোধ সম্ভব না হলেও, সঠিক পরিবেশ শিশুর ভাষার বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে:

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যান:

✅ মনে রাখুন

প্রতিটি শিশুর বিকাশের গতি আলাদা, তাই কিছুটা দেরি সবসময় দুশ্চিন্তার কারণ নয়। তবে যত আগে কারণ শনাক্ত করে হস্তক্ষেপ শুরু করা যায়, শিশুর ভাষা ও সার্বিক বিকাশ তত ভালো হয়। সন্দেহ হলে অপেক্ষা না করে একজন অভিজ্ঞ শিশু ও নবজাতক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

ডা. মো. নাজমুল হাসান

MBBS, BCS (Health), MD (Paediatrics) | শিশু বিশেষজ্ঞ ও নবজাতক বিশেষজ্ঞ, চাঁদপুর

চাঁদপুরের অন্যতম বিশ্বস্ত শিশু ও নবজাতক বিশেষজ্ঞ ডা. নাজমুল হাসান NICU ও PICU-তে প্রশিক্ষিত এবং সিঙ্গাপুর থেকে আন্তর্জাতিক শিশু পুষ্টি সার্টিফিকেশনপ্রাপ্ত। শিশুর কথা বলতে দেরি, বিকাশজনিত সমস্যাসহ জটিল শিশু স্বাস্থ্য সমস্যায় তিনি বিশেষভাবে দক্ষ। তিনি ডাক্তার বাড়ী, টেকনো হান্নান কমপ্লেক্স, হাজী মহসিন রোড, চাঁদপুরে প্রতিদিন বিকাল ২:৩০টা থেকে রোগী দেখেন।